প্রিন্ট এর তারিখঃ ফেব্রুয়ারী ৮, ২০২৬, ১২:৪৫ এ.এম || প্রকাশের তারিখঃ ফেব্রুয়ারি ৭, ২০২৬, ৯:১৬ অপরাহ্ণ
জয়পুরহাট–২ আসন ৷৷ সবুজের টার্নিং পয়েন্টে দাঁড়িয়ে ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লা
ছবিঃ জয়পুর কণ্ঠ
কালাই–ক্ষেতলালে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই ৷৷ আক্কেলপুরে নির্ধারিত হতে পারে ভাগ্য
বিশেষ প্রতিবেদনঃ ৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন–২০২৬ সামনে রেখে জয়পুরহাট–২ আসন (কালাই, ক্ষেতলাল ও আক্কেলপুর) এখন রাজনৈতিক উত্তাপে টগবগ করছে। মাঠপর্যায়ের হিসাব বলছে, এই আসনে কালাই ও ক্ষেতলালে ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লার মধ্যে হবে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই। আর পুরো নির্বাচনের ভাগ্য নির্ধারণে বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারে আক্কেলপুর উপজেলা।
নির্বাচনের শুরুতে জয়পুরহাট–২ আসনে একাধিক ত্যাগী নেতা মনোনয়নপত্র জমা দিলেও শেষ পর্যন্ত সবাই তা প্রত্যাহার করেন। সর্বশেষ ১৯ জানুয়ারি সাবেক এমপি ইঞ্জিনিয়ার গোলাম মোস্তফা মনোনয়ন প্রত্যাহার করলে মাঠে একক প্রার্থী হিসেবে রয়ে যান আব্দুল বারী।
প্রথম দিকে সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে দৃশ্যমান তৎপরতা থাকলেও দলীয় সিদ্ধান্ত ও বহিষ্কারের আশঙ্কায় একে একে সবাই নীরব হয়ে পড়েন। ফলে বর্তমানে এককভাবে প্রচারণা চালাচ্ছেন আব্দুল বারী। তবে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠেছে, দীর্ঘদিনের লড়াকু ও পরীক্ষিত নেতাদের বাদ দিয়ে কীভাবে তিনি মনোনয়ন পেলেন?
‘উড়ে আসা’ নেতৃত্ব বনাম তৃণমূল স্থানীয়দের অভিযোগ, আব্দুল বারী প্রশাসনের ক্যাডার হিসেবে দীর্ঘদিন এলাকার বাইরে ছিলেন। এলাকার সুখ–দুঃখে তাকে তেমনভাবে পাওয়া যায়নি। অথচ তার দুই সন্তান বিদেশে পড়াশোনা করছেন, যা তৃণমূলের সঙ্গে তার দূরত্বের প্রতীক হিসেবেই দেখছেন অনেকে।
রাজনীতির মাঠে ‘নেতার সংখ্যা বেশি’ এ কথাটি এখানে বিশেষভাবে প্রযোজ্য। স্থানীয় নেতারা যদি নিজেদের অনুসারীদের নিয়ে সক্রিয়ভাবে মাঠে নামেন, তাহলে ফল পাল্টে যেতে পারে। আর তারা যদি নীরব থাকেন, সেই নীরবতাই আব্দুল বারীর জন্য হয়ে উঠতে পারে ‘মৃত্যুকূপ’। সে সুযোগে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক জয়পুরহাট–২ আসনে অনেকটাই এগিয়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
কালাই–ক্ষেতলাল: হাড্ডাহাড্ডি সমীকরণ
কালাই ও ক্ষেতলাল উপজেলায় সরেজমিনে কথা বলে জানা গেছে, এখানে ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লার ভোট প্রায় সমানে সমান। কোনো পক্ষই নিশ্চিতভাবে এগিয়ে নেই। ছোট ছোট ভোট বিভাজনই এখানে বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়াতে পারে।
আক্কেলপুর ‘কিং মেকার’ ভূমিকাঃ
পুরো আসনের মধ্যে আক্কেলপুর উপজেলা সবচেয়ে কৌশলগত অবস্থানে। কারণ জয়পুরহাট–২ আসনের বেশিরভাগ শীর্ষ নেতার বাড়ি আক্কেলপুরে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থীর বাড়িও এই উপজেলায় এখানকার ভোটাররা ঐতিহাসিকভাবে দল নয়, ব্যক্তি বিবেচনায় ভোট দিয়ে থাকেন এ কারণে আক্কেলপুরকে বলা হচ্ছে এই আসনের ‘টার্নিং পয়েন্ট’। বিশ্লেষকদের মতে, এখানে যে পক্ষ এগিয়ে যাবে, জয়পুরহাট–২ আসনের ফলাফল অনেকটাই তার দিকে ঝুঁকে পড়বে।
জয়পুরহাট–২ আসনের ভোটের রাজনীতি: সংক্ষিপ্ত ইতিহাস (১৯৯১–২০২৬)
বিএনপির দুর্গ (১৯৯১–২০০৬)
১৯৯১ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত জয়পুরহাট–২ ছিল বিএনপির অবিসংবাদিত ঘাঁটি।
১৯৯১: বিএনপি ৫০.৫% ভোট
১৯৯৬ (জুন): বিএনপি ৪৭.৯%
২০০১: বিএনপি ৫৭.৫%
এই সময়ে বিএনপি–জামায়াত মিলিত ভোট ছিল ৬৫–৭০ শতাংশের কাছাকাছি।
প্রথম ফাটল (২০০৮)
২০০৮ সালে বিএনপি প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার গোলাম মোস্তফা মাত্র ৩,১৬০ ভোটে জয়ী হন। আওয়ামী লীগের প্রার্থী পান প্রায় সমান ভোট। এখান থেকেই পালাবদলের ইঙ্গিত।
আওয়ামী লীগের আধিপত্য (২০১৪–২০২৪)
২০১৪: বিএনপির বয়কট, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়
২০১৮ ও ২০২৪: আওয়ামী লীগ ধারাবাহিকভাবে বিজয়ী এই সময় বিএনপি সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে।
দাঁড়িপাল্লার জন্য সুযোগের জানালাঃ
সব দিক বিবেচনায় জয়পুরহাট–২ আসনের এবারের নির্বাচন জামায়াতে ইসলামির জন্য একটি বাস্তব সম্ভাবনার জানালা খুলে দিয়েছে। কালাই ও ক্ষেতলালে ধানের শীষের সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই এবং বিএনপির অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ ও নীরবতা ভোটের সমীকরণকে জটিল করে তুলেছে। এই শূন্যস্থান পূরণ করার সুযোগ নিচ্ছে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক।
বিশেষ করে আক্কেলপুর উপজেলা এবার হয়ে উঠতে পারে ‘গেম চেঞ্জার’। এই উপজেলার ভোটাররা ঐতিহ্যগতভাবে ব্যক্তি, নৈতিকতা ও স্থানীয় সংযোগকে গুরুত্ব দিয়ে ভোট দিয়ে থাকেন। দাঁড়িপাল্লার প্রার্থীর বাড়ি আক্কেলপুর হওয়ায় এখানে একটি প্রাকৃতিক অ্যাডভান্টেজ তৈরি হয়েছে, যা সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে পুরো আসনের ফলাফল পাল্টে যেতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যদি বিএনপির ভেতরের কোন্দল ও কর্মীদের নিষ্ক্রিয়তা শেষ পর্যন্ত কাটিয়ে না ওঠে, তবে ধানের শীষের একটি বড় অংশের ভোট দাঁড়িপাল্লার দিকে সরে যাওয়ার বাস্তব সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে তরুণ ও নীরব ভোটারদের মধ্যে জামায়াতে ইসলামির প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে মাঠপর্যায়ের তথ্য ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, জয়পুরহাট–২ আসনে এবারের নির্বাচন কেবল দলীয় শক্তির লড়াই নয়, বরং এটি হয়ে উঠেছে সংগঠন, শৃঙ্খলা ও মাঠপর্যায়ের সক্রিয়তার পরীক্ষা। সেই পরীক্ষায় যদি জামায়াতে ইসলামি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ঐক্য ও জনসংযোগ ধরে রাখতে পারে, তবে জয়পুরহাট–২ আসনে দাঁড়িপাল্লার বিজয় আর অনুমান নয়- বাস্তবতায় রূপ নিতে পারে।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মোঃ শামছুল আলম, সদর রোড, আমতলী, মিডিয়া লেন, জয়পুরহাট-৫৯০০
মোবাইলঃ ০১৭৩৫-২২১৬৬৪, ০১৯৯৩-৭৬৩৪৩৩, ই-মেইলঃ wjoypurkantha@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত