ছবিঃ সংগীত
জাহিদুল ইসলাম (জাহিদ)
স্টাফ রিপোর্টারঃ ৩০ জুলাই ২০২৬
ঋণের কিস্তির টাকা পরিশোধ করতে না পেরে নিজের শরীরের অতি মূল্যবান অঙ্গ কিডনি বিক্রির মতো আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার এক দিনমজুর। তাঁর দাবি, ১০ লাখ টাকার প্রলোভন দেখিয়ে একটি সংঘবদ্ধ আন্তর্জাতিক কিডনি পাচারকারী চক্র তাঁকে ভারত হয়ে নেপালে নিয়ে যায়। সেখানে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তাঁর একটি কিডনি অপসারণ করা হলেও দেশে ফেরার পর প্রতিশ্রুত অর্থ না দিয়ে মাত্র ৫০ হাজার টাকা হাতে ধরিয়ে দিয়ে আত্মগোপনে চলে যায় চক্রটি। দীর্ঘদিন বিচার না পেয়ে অবশেষে তিনি জয়পুরহাট আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন।
মামলার অভিযোগ ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ভুক্তভোগী মন্টু মিয়া সংসারের অভাব মেটাতে স্থানীয় কয়েকটি এনজিও ও মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়েছিলেন। দিনমজুরির সামান্য আয়ে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে না পারায় পাওনাদারদের চাপ বাড়তে থাকে। এমন পরিস্থিতিতে জয়পুরহাটের কালাই এলাকায় সক্রিয় একটি দালাল চক্র তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে। দালালরা তাঁকে জানায়, ঢাকার এক ধনী নারী কিডনি জটিলতায় ভুগছেন এবং একটি কিডনি দিলে বিনিময়ে ১০ লাখ টাকা দেওয়া হবে। ওই টাকা দিয়ে সব ঋণ শোধ করে নতুন জীবন শুরু করা যাবে—এমন আশ্বাসেই তিনি রাজি হন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, দালাল চক্রটি দ্রুত তাঁর পাসপোর্ট তৈরি করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের ব্যবস্থা করে। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের শুরুতে অগ্রিম হিসেবে ৫০ হাজার টাকা দিয়ে প্রথমে তাঁকে ভারতে এবং পরে নেপালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে একটি বেসরকারি হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তাঁর শরীর থেকে একটি কিডনি অপসারণ করা হয়।
আদালত প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে মন্টু মিয়া বলেন, ঋণের কিস্তির টাকা শোধ করতে না পেরে তিনি দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন। দালালরা ১০ লাখ টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও কিডনি অপসারণের পর মাত্র ৫০ হাজার টাকা দিয়ে দেশে পাঠিয়ে দেয়। পরে বাকি টাকা চাইলে তাঁকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। বর্তমানে তিনি আগের মতো কাজ করতে পারেন না এবং সংসার চালানোর মতো শারীরিক সক্ষমতাও হারিয়েছেন।
ভুক্তভোগীর অভিযোগ, অস্ত্রোপচারের পর অল্প কয়েকদিন চিকিৎসা দিয়ে তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। এরপর প্রতিশ্রুত বাকি ৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা চাইলে দালালরা যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। স্থানীয়ভাবে একাধিকবার বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করা হলেও কোনো সমাধান হয়নি। বরং ঘটনাটি প্রকাশ করলে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয় বলে তিনি অভিযোগ করেন।
একটি কিডনি হারানোর পর মন্টু মিয়া নিয়মিত শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন। সামান্য পরিশ্রম করলেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলায় স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন বলে পরিবারের সদস্যরা জানান। তাঁদের ভাষ্য, প্রতিশ্রুত টাকাও পাওয়া যায়নি, আবার পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তির শারীরিক সক্ষমতাও নষ্ট হয়ে গেছে। এখন চিকিৎসার ব্যয় বহনের সামর্থ্যও তাদের নেই।
প্রতারণার শিকার হয়ে গত ১৩ জুন জয়পুরহাটের আমলি আদালত-৫-এ মন্টু মিয়া বাদী হয়ে ছয়জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও তিন থেকে চারজনকে আসামি করে একটি সিআর মামলা দায়ের করেন। আদালতের নির্দেশে পরদিন ১৪ জুন কালাই থানায় মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন-এর আওতায় মামলাটি এফআইআর (মামলা নং-১৪) হিসেবে নথিভুক্ত হয়।
মামলায় বগুড়া সদর উপজেলার নিশিন্দারা (খাঁপাড়া) এলাকার সাব্বির আহমেদ, বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার কিচক মল্লিকপাড়া গ্রামের সুমন আলী, জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার উদয়পুর ইউনিয়নের পাইকপাড়া গ্রামের আব্দুল মান্নান ও সাইদুর রহমান, একই উপজেলার বহুতি গ্রামের আব্দুস ছাত্তার এবং নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার ছোট হোসেনপুর রাজাগঞ্জ এলাকার তারেক আজম ওরফে বাবলু চৌধুরীকে আসামি করা হয়েছে। এছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও তিন থেকে চারজনকে মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, আসামিরা পরস্পরের যোগসাজশে ভুক্তভোগীকে ১০ লাখ টাকার প্রলোভন দেখিয়ে বিদেশে নিয়ে গিয়ে প্রতারণার মাধ্যমে তাঁর একটি কিডনি অপসারণ করে প্রতিশ্রুত অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। মামলাটি বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে।
কালাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলাম বলেন, আদালতের নির্দেশে মামলাটি নথিভুক্ত করা হয়েছে। এটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও গুরুতর অভিযোগ। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত এবং প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহে পুলিশ কাজ করছে।
জয়পুরহাট জেলা জজ আদালতের আইনজীবী মো. উজ্জ্বল হোসেন বলেন, দরিদ্র মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে বিদেশে নিয়ে অঙ্গ অপসারণের অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। অভিযোগ প্রমাণিত হলে এটি সংঘবদ্ধ অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
ঘটনাটি সামনে আসার পর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও দেখা দিয়েছে। একজন দরিদ্র দিনমজুরকে কীভাবে এত সহজে পাসপোর্ট করিয়ে বিদেশে নেওয়া হলো, ভারত হয়ে নেপালে চিকিৎসার নামে অঙ্গ অপসারণের পুরো প্রক্রিয়ায় কারা সহযোগিতা করেছে, সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল, দালাল ও অর্থ লেনদেনের নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদের শনাক্ত করা সম্ভব হবে কি না এবং এর পেছনে আরও বড় কোনো আন্তর্জাতিক অঙ্গ পাচারকারী নেটওয়ার্ক সক্রিয় রয়েছে কি না—এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।
মন্টু মিয়ার অভিযোগের সত্যতা তদন্তে প্রমাণিত হলে শুধু একজন ভুক্তভোগীর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই নয়, দেশের দরিদ্র মানুষকে টার্গেট করে সক্রিয় সম্ভাব্য অঙ্গ পাচারকারী চক্রের কার্যক্রমও উন্মোচিত হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিমত।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মোঃ শামছুল আলম, সদর রোড, আমতলী, মিডিয়া লেন, জয়পুরহাট-৫৯০০
মোবাইলঃ ০১৭৩৫-২২১৬৬৪, ০১৯৯৩-৭৬৩৪৩৩, ই-মেইলঃ wjoypurkantha@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত