
ছবিঃ জয়পুর কণ্ঠ
জয়পুর কণ্ঠঃ জয়পুরহাট-১ আসনে বাসদ (মার্কসবাদী) প্রার্থী তৌফিকা দেওয়ান লিজা স্কুল বিশ্ববিদ্যালয় রাজনৈতিক জীবন সম্পর্কে জয়পুর কণ্ঠ পাঠকের সামনে সংক্ষিপ্তভাবে বলুন?
তৌফিকা দেওয়ান লিজাঃ ২০০৯ সালে জয়পুরহাট সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি, ২০১১ সালে আমদই ইউনাইটেড ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি, এরপর ইডেন মহিলা কলেজ থেকে রসায়নে অনার্স-মাস্টার্স। ছাত্র জীবন থেকে রাজনীতির সাথে যুক্ত। ইডেনে সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছি। বর্তমানে বাংলাদেশ নারীমুক্তি কেন্দ্রের কেন্দ্রীয় অর্থ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছি।

জয়পুর কণ্ঠঃ ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচন উপলক্ষে বাসদ (মার্কসবাদী) সারাদেশে প্রায় ৩৪টি আসনে প্রার্থী দেওয়ার প্রাথমিক ঘোষণা দিয়েছে। আপনি একজন কেন্দ্রীয় নেত্রী হয়ে নিজ এলাকায় শক্তিশালী প্রার্থীদের মোকািবলায় কিভাবে কাজ করছেন?
তৌফিকা দেওয়ান লিজাঃ আমাদের দল বাসদ(মার্কসবাদী) সারাদেশে ৩৪ টি আসনে নির্বাচনে লড়ছে। যার মধ্যে ১০ টি আসনে নারী প্রার্থী রয়েছে। যা প্রায় ৩০ শতাংশ। কোন রাজনৈতিক দল এতো শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনীত করেনি। আমাদের দল সর্বচ্চো সংখ্যক নারী প্রার্থী মনোনীত করার মধ্য দিয়ে তার নারী সম্পর্কিত দৃষ্টিভঙ্গী এবং নারীর রাজনৈতিক অধিকারের প্রশ্নে দৃঢ় অবস্হানের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্হাপন করেছে।আমার লড়াইটা শক্তিশালী প্রার্থীদের মোকাবিলা করার লড়াই নয়। আমার লড়াই তৃণমূলে কৃষক-শ্রমিক -মেহনতী মানুষকে তার অধিকার সম্পর্কে সচেতন করা।
জয়পুর কণ্ঠঃ আগস্টের পর তরুণ সমাজ রাজনীতিতে পরিবর্তন চাইছে। আপনি একজন প্রার্থী হিসেবে এলাকার তরুণ ভোটারদের বা ছাত্র ছাত্রীদের দাবি-দাওয়া পূরণ আপনার বিশেষ কোনো কর্মসূচি আছে কি?
তৌফিকা দেওয়ান লিজাঃ আমি জয়পুরহাটে একটি মাদকমুক্ত সুস্থ পরিবেশ নির্মাণে লড়াই করছি। নারী-শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য লড়াই করছি। ছাত্র-ছাত্রী এবং তরুণদের সাথে নিয়ে আমরা পাড়ায়-পাড়ায় পাঠাগার, বিজ্ঞান ক্লাব সহ নানা ধরনের সামাজিক সংগঠন গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছি।
জয়পুর কণ্ঠঃ বাম দলগুলোর বড় দুর্বলতা হলো তৃণমূল পর্যায়ে পর্যাপ্ত কর্মী না থাকা। আপনি বড় বড় রাজনৈতিক দলগুলোর বিপরীতে যেখানে ব্যাপক জনসংযোগ করা কঠিন, সেখানে জয়পুরহাটের প্রান্তিক ভোটারদের কাছে আপনার কাচি মার্কার বার্তা কীভাবে পৌঁছে দেবেন?
তৌফিকা দেওয়ান লিজাঃ জয়পুরহাট ১ আসন একটি বিস্তৃত এলাকা। এখানে প্রতিটা মানুষের কাছে পৌঁছানো অত্যন্ত কঠিন। আমি নিজে গ্রামে-গ্রামে হাটে,বাজারে মানুষের কাছে যাচ্ছি। উঠান বৈঠক, মতবিনিময়, পথসভার মধ্যে দিয়ে গণসংযোগ করছি। আমাদের প্রচার টীম যাচ্ছে। পাড়া প্রতিবেশী, আত্মীয় স্বজনও দায়িত্ব নিয়েছে। তারা নিজ দায়িত্বে কাঁচি মার্কার বার্তা জনগণের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে।
জয়পুর কণ্ঠঃ এলাকার প্রধান সমস্যাগুলো (যেমন: কৃষিভিত্তিক শিল্পায়ন বা কর্মসংস্থান) নিয়ে আপনার কোনো সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ আছে কি, নাকি অন্যান্য প্রার্থীর মতো তিনিও কেবল গৎবাঁধা বুলি আউড়াচ্ছেন?
তৌফিকা দেওয়ান লিজাঃ জয়পুরহাট একটি কৃষিভিত্তিক এলাকা। এখানে আলু চাষীদের জন্য বিশেষায়িত হিমাগার তৈরি, জয়পুরহাট চিনকল আধুনিকায়ন করে পর্যাপ্ত শ্রমিক নিয়োগ, পোল্ট্রি শিল্পকে উন্নত করার লক্ষ্যে খামারিদের সংগঠিত করার উদ্যোগ আমরা নিয়েছি।
জয়পুর কণ্ঠঃ আপনার দল জনপ্রিয়তার শীর্ষে নেই জেনেও নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে—এই নির্বাচনে অংশগ্রহণের মূল রাজনৈতিক লক্ষ্য কী?
তৌফিকা দেওয়ান লিজাঃ এই নির্বাচনে অংশগ্রহনের মূল রাজনৈতিক লক্ষ্য কৃষক -শ্রমিক-মেহনতী মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে গণআদালনের শক্তিকে বিকশিত করা।
জয়পুর কণ্ঠঃ জয়পুরহাটে আপনার প্রচারণায় সবচেয়ে বড় বাধা কী—অর্থ, কর্মী না রাষ্ট্রীয় পরিবেশ?
তৌফিকা দেওয়ান লিজাঃ বিষয়টা ঠিক বাধা নয়। জনগন তার অধিকার সম্পর্কে সচেতন নয়। জনগনকে তার লড়াইয়ে উদ্বুদ্ধ করতেই আমরা নির্বাচনে অংশ নিয়েছি। আমরা একটা নতুন ধারার রাজনীতি জনগণের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করতে চাই। আমাদের বক্তব্যের গ্রহণযোগ্যতা জনগণের মধ্যে আছে। আমাদের লড়াইয়ের শক্তিই জনগণকে বিকল্প খুঁজে নিতে পথ দেখাবে।
জয়পুর কণ্ঠঃ মাঠে নামার পর সাধারণ মানুষ আপনাকে কীভাবে গ্রহণ করছে?
তৌফিকা দেওয়ান লিজাঃ জনগণের অকুণ্ঠ ভালোবাসা ও প্রাণঢালা অভিনন্দন পেয়েছি। আমাদের রাজনৈতিক বক্তব্য জনগণ সমর্থন করেছে। নিজ উদ্যোগে প্রচারণার কাজে সহযোগিতা করেছে।
জয়পুর কণ্ঠঃ একজন নারী প্রার্থী হিসেবে আলাদা কোনো অভিজ্ঞতা হচ্ছে কি?
তৌফিকা দেওয়ান লিজাঃ নারী প্রার্থী হিসেবে অভিজ্ঞতা তো নিশ্চয়ই আলাদা। নারীদের জন্য রাজনীতির মাঠ আমাদের সমাজে খুব অনুকূল নয়। নারীর ক্ষমতায়নের কথা যতোই বলা হোক না কেন নারীর রাজনৈতিক অধিকার সম্পর্কে সমাজ এখনো সচেতন হয়নি। এক্ষেত্রে সবচেয়ে পিছিয়ে আছে নারীরা নিজেই।
জয়পুর কণ্ঠঃ গ্রামাঞ্চলে প্রচারণায় গেলে নারীরা কীভাবে সাড়া দিচ্ছেন? তারা কি আপনাকে নিজেদের প্রতিনিধি মনে করছেন?
তৌফিকা দেওয়ান লিজাঃ নিশ্চয়ই মনে করছেন। কারণ আমরা কোন প্রতিশ্রুতির নির্বাচন করছিনা। আমরা একজন নারীকে তার জীবনের যন্ত্রণা ও সামাজিক বঞ্চনার বিরুদ্ধে মানুষ হিসেবে মর্যাদা নিয়ে দাঁড়ানোর কথা বলছি। এই বক্তব্যের সাথে কোন নারীই বিরোধ করতে পারেনা।
জয়পুর কণ্ঠঃ কাচি প্রতীকটি সাধারণ ভোটারের কাছে কী বার্তা বহন করে বলে আপনি মনে করেন?
তৌফিকা দেওয়ান লিজাঃ কাঁচি প্রতীক ন্যায় ও বৈষম্যহীনতার প্রতীক। কাঁচি প্রতীক লড়াইয়ের প্রতীক। কাঁচি প্রতীক ন্যায়-নীতি-মূল্যবোধ ও মনুষ্যত্বের প্রতীক।
জয়পুর কণ্ঠঃ আপনার দলের সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র কাঠামোর ধারণা—সাধারণ মানুষকে কীভাবে বোঝাচ্ছেন?
তৌফিকা দেওয়ান লিজাঃ একটা সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পূর্ব শর্ত হিসেবে সেই রাষ্ট্রকে প্রথমত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সমস্ত বৈশিষ্ট্য অর্জন করতে হবে। সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করতে হবে। শ্রমিকশ্রেনীর লড়াইয়ের মধ্যে দিয়েই একটি শোষণ-বৈষম্যহীন রাষ্ট্রের আকাঙ্খা মানুষের মধ্যে প্রতিফলিত হবে।
জয়পুর কণ্ঠঃ বাজেটে কৃষি ও শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর কথা বলেন—বর্তমান বাজেট কাঠামোর কোন দিকটি সবচেয়ে অন্যায্য বলে মনে হয়?
তৌফিকা দেওয়ান লিজাঃ সামরিক খাতে ব্যায় বাড়ানো সবচেয়ে অন্যায্য মনে করি।
জয়পুর কণ্ঠঃ শ্রমজীবী মানুষের ক্ষমতায়নের প্রশ্নে সংসদ কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে বলে আপনি বিশ্বাস করেন?
তৌফিকা দেওয়ান লিজাঃ শ্রমজীবী মানুষের অধিকার তখনই প্রতিষ্ঠা পাবে যখন সংসদে তার শ্রেণীর প্রতিনিধি থাকবে।
জয়পুর কণ্ঠঃ জয়পুরহাটবাসী দীর্ঘদিন থেকে উন্নয়ন বঞ্চিত। আপনি নির্বাচিত হলে জয়পুরহাটকে কিভাবে উন্নয়ন করতে চান?
তৌফিকা দেওয়ান লিজাঃ জয়পুরহাটের কৃষক-শ্রমিক-মেহনতী মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে গণআন্দোলন গড়ে তুলতে চাই। আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে মানুষ তার অধিকার সম্পর্কে সচেতন হলে তখনই তার জীবন মানের উন্নয়ন সম্ভব।
জয়পুর কণ্ঠঃ সন্ত্রাস, ঘুষ, দুর্নীতি, চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে আপনার দলের অবস্থান কি?
তৌফিকা দেওয়ান লিজাঃ সন্ত্রাস, ঘুষ, দুর্নীতি, চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে আমার দল সবসময় প্রতিবাদ করে এসেছে।
জয়পুর কণ্ঠঃ জয়পুরহাট–১ আসনের মানুষের সবচেয়ে বড় সমস্যা কী বলে আপনার কাছে মনে হয়েছে?
তৌফিকা দেওয়ান লিজাঃ এটি কৃষি প্রধান এলাকা। এখানে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে কৃষি কাজের সাথে যুক্ত। অনুন্নত কৃষি ব্যবস্হাপনা এখানকার সবচেয়ে বড় সংকট মনে করি।
জয়পুর কণ্ঠঃ হ্যাঁ বা না ভোটের বিষয়ে আপনার দলের অবস্থান কি? হ্যাঁ বা না ভোটের বিষয়ে ভোটারের কেমন সাড়া পাচ্ছেন?
তৌফিকা দেওয়ান লিজাঃ আমরা সংস্কারের পক্ষে। তবে যে প্রক্রিয়ায় গণভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে সেই প্রক্রিয়াকে সঠিক মনে করি না।
জয়পুর কণ্ঠঃ যদি নির্বাচনে জয়ী না হন, এই নির্বাচন আপনার রাজনৈতিক লড়াইয়ে কী ভূমিকা রাখবে?
তৌফিকা দেওয়ান লিজাঃ আমি নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করেছি জনগণকে তার অধিকার সম্পর্কে সচেতন করতে। নির্বাচন যে তার ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটাতে পারবেনা সেই বক্তব্যটি তুলে ধরতে। এই নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে আমি অত্র এলাকার কৃষক -শ্রমিক মেহনতী মানুষকে সংগঠিত করে আন্দোলন গড়ে তুলতে চাই। ফলে নির্বাচনে হেরে গেলেও আমি জনগণের মধ্যেই থাকবো। জনগণকে লড়াইয়ে ঐক্যবদ্ধ করবো।
জয়পুর কণ্ঠঃ তরুণ প্রজন্মকে বাম রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট করতে আপনার কী পরিকল্পনা আছে?
তৌফিকা দেওয়ান লিজাঃ তরুণ প্রজন্মের সামনে আমাদের দেশে বাম আন্দোলনের গৌরবজ্জল ভূমিকা, মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস, বড় মনীষীদের জীবন চর্চার নানাবিধ আয়োজন রাখা।
জয়পুর কণ্ঠঃ একজন নারী হিসেবে রাজনীতিতে টিকে থাকার ক্ষেত্রে আপনি সবচেয়ে বেশি কোন সামাজিক বাধার মুখে পড়েছেন?
তৌফিকা দেওয়ান লিজাঃ নারীর রাজনৈতিক অধিকার সম্পর্কে জনগণের অসচেতনতা।
জয়পুর কণ্ঠঃ জয়পুরহাট–১ আসনের ভোটারদের উদ্দেশ্যে আপনার শেষ বার্তা কী—কেন তারা কাচি মার্কায় ভোট দেবেন?
তৌফিকা দেওয়ান লিজাঃ ন্যায়-নীতি-মূল্যবোধের ঝান্ডাকে উর্ধ্বে তুলে ধরতে এবং গণআন্দোলনের শক্তিকে বিকশিত করতে কাঁচি মার্কায় ভোট দিন।
জয়পুর কণ্ঠঃ দীর্ঘ সময় সাক্ষাৎকার প্রদানের জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
তৌফিকা দেওয়ান লিজাঃ আপনাকেও অসংখ্য ধন্যবাদ।