
ছবিঃ প্রতিকী
-: কোর্ট রিপোর্টার :-
জয়পুরহাট আইনজীবী সমিতিতে বহু বছর ধরে একটি পরম্পরা চলে আসছিল—ঈদুল কোরবানীতে অসহায় আইনজীবীদের কেন্দ্র করে বোনাস চালু করা হয়। এটি ছিল শুধু আর্থিক সহায়তা নয়, বরং সামাজিক মর্যাদা ও মানবিক সহমর্মিতার একটি প্রকাশ।
সেদিন কী ঘটেছিল?
হঠাৎ বোনাস বন্ধ করে দেওয়ায় অনেক আইনজীবী কোরবানির আনন্দ থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন। নিজের সন্তানদের নতুন পোশাক দিতে না পারা আর সামাজিকভাবে হেয় হওয়ার সেই যাতনা কি ভুলে যাওয়া যায়?
২০২৩ সালে তদানীন্তন আওয়ামী লীগের জিপি এ্যাড. মোমিন আহমেদ চৌধুরী এবং আওয়ামী লীগের পিপি এ্যাড. নৃপেন্দ্রনাথ মন্ডল কিছু সহযোগীর সঙ্গে মিলে ২০/২৫ জন অসহায় আইনজীবীর বোনাস হঠাৎ বন্ধ করে দেন। এই আচরণ অনেককে কোরবানী দেওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করেছিল এবং সামাজিকভাবে হেয় মর্যাদা সৃষ্টি করেছিল।
ধর্মীয় ও নৈতিক দিক থেকে এটি কোরআনের নীতি ও হাদিসের বিপরীত।
আল্লাহ তাআলা কোরআনে বলেনঃ
“তোমরা যারা দারিদ্রকে সাহায্য করবে, আমি তোমাদের সাহায্য করব; আর যারা দুঃখিতের অধিকার হরণ করবে, তাদের শাস্তি আমি দেব।”
—সূরা আনফাল, আয়াত ৭২
“নিশ্চয়ই আল্লাহ ইনসাফ ও সদাচারের নির্দেশ দেন…” (সূরা নাহল: ৯০)।
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন আমানতসমূহ তার হকদারদের কাছে পৌঁছে দিতে। আর যখন মানুষের মধ্যে বিচার ফয়সালা করবে, তখন ন্যায়বিচারের সাথে করবে।” — (সূরা নিসা, আয়াত: ৫৮)
আল্লাহ তায়ালা বলেন:
“তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না এবং মানুষের ধনের কিয়দাংশ জেনে-শুনে পাপপথে গ্রাস করার উদ্দেশ্যে তা বিচারকদের (কর্তৃপক্ষের) কাছে পেশ করো না।”
— (সূরা বাকারা, আয়াত: ১৮৮)
যারা মানুষের হক আত্মসাৎ করে বা ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করে, তারা সাময়িকভাবে জয়ী হলেও আল্লাহর বিচার থেকে পার পাবে না।
হাদিসেও আছে:
“যে ব্যক্তি দুঃখিত বা অসহায়কে সাহায্য করে, আল্লাহ তাকে সহায়তা করেন। আর যে দুঃখিতের অধিকার হরণ করে, তার জন্য শাস্তি রয়েছে।” সাহিহ মুসলিম, হাদিস ২৬৯৯
“মজলুমের বদদোয়া থেকে বেঁচে থাকো, কারণ তার দোয়া ও আল্লাহর মাঝে কোনো আড়াল নেই।” (সহিহ বুখারি)
কেয়ামতের দিন আমি তিন ব্যক্তির বিপক্ষে থাকব (অর্থাৎ আল্লাহ নিজেই তাদের বিরুদ্ধে মামলা লড়বেন)। তাদের একজন হলো সেই ব্যক্তি, যে কাউকে দিয়ে কাজ করিয়ে নিল এবং পূর্ণ কাজ আদায় করল, কিন্তু তার মজুরি দিল না।”
— (সহিহ বুখারি, হাদিস নং ২২২৭)
রাসূলুল্লাহ (সা.) সাহাবীদের জিজ্ঞেস করলেন—
“তোমরা কি জানো নিঃস্ব কে? সাহাবীরা বললেন, যার টাকা-পয়সা নেই। নবীজি বললেন, না; আমার উম্মতের মধ্যে নিঃস্ব সেই ব্যক্তি, যে কিয়ামতের দিন নামাজ-রোজা-যাকাত নিয়ে আসবে, কিন্তু সে কাউকে গালি দিয়েছে, কারও রক্তপাত করেছে এবং কারও সম্পদ আত্মসাৎ করেছে। তখন তার নেকিগুলো পাওনাদারদের দিয়ে দেওয়া হবে এবং নেকি শেষ হয়ে গেলে পাওনাদারদের গুনাহ তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে।”
— (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ২৫৮১)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেনঃ
“মুনাফিকের চিহ্ন তিনটি: যখন কথা বলে মিথ্যা বলে, যখন ওয়াদা করে তা ভঙ্গ করে এবং যখন তার কাছে কোনো আমানত রাখা হয়, সে তাতে খেয়ানত করে।”
— (সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৩৩)
আল্লাহর মহাপরিকল্পনার সামনায় ২০২৩ সালে বোনাস বন্ধ করার পরিকল্পনাকারীরা সফল হতে পারেননি। ২০২৩ সালে বোনাস নিয়েছেন এ্যাড. মোমিন আহমেদ চৌধুরী তারপর ২০২৪ সালের আর বোনাস নিতে পারেন নাই। এর মধ্যে পরপারের টিকেট হাতে ধরিয়ে দিয়েছেন মহান আল্লাহ সোবহানুতায়ালা।
২০২৪ সালে বোনাস না পেয়ে অনেক মজলুম আইনজীবী কোরবানী দিতে সক্ষম হয় নাই। ২০২৪ সালে বোনাস নিয়ে ২০২৫ সালের বোনাস নিতে পারে নাই এ্যাড. নৃপেন্দ্র নাথ মন্ডল। এর মধ্যে প্রায়ত তার নামের সাথে লেগে গেছে।
২০২৫ সালে বোনাস ধারাবাহিকভাবে কার্যকর। সংস্কার ধারাবাহিক কার্যক্রম এর আওতায় ২০২৫ বোনাস নিয়েছেন কিন্তু ২০২৬ সালের বোনাস নিতে পারবে না এই ধারাবাহিকতায় প্রায়ত কে হতে যাচ্ছেন?
উপসংহার:
অসহায় আইনজীবীদের বোনাস বন্ধের উদ্যোগ ধর্মীয় ও সামাজিক দিক থেকে ন্যায়পরায়ণ নয়। কোরআন ও হাদিসের আলোকে দেখা যায়, ধারাবাহিক ন্যায় প্রতিষ্ঠা, দুঃখিত ও অসহায়দের সহায়তা করা মুসলিম সমাজের মৌলিক নীতি। সমাজ ও সমিতি কর্তৃক ধারাবাহিক সংস্কার এবং পুনঃপ্রাপ্যতা নিশ্চিত করায় মানবিক ও ধর্মীয় ন্যায় প্রতিষ্ঠিত করা।
অবিলম্বে ২০/২৫ জন আইনজীবীর বকেয়া বোনাস বুঝিয়ে দিন। বঞ্চিত পরিবারগুলোর মুখে হাসি ফিরিয়ে দিন। বার এসোসিয়েশনকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ঊর্ধ্বে রাখুন।
”ইনসাফ কায়েম করুন, নতুবা আল্লাহর আদালতের জন্য প্রস্তুত হোন।”