জয়পুরহাটের কাদোয়ার মাটি থেকে রেলভবনের শীর্ষে সুবক্তগীণ
প্রতিনিধির নাম :
-
প্রকাশিত:
শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
-
১৯
বার পড়া হয়েছে

ছবিঃ জয়পুর কণ্ঠ
স্টাফ রিপোর্টারঃ ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
তুলশীগঙ্গা-হারাবতীর মোহনার কাছে যে স্বপ্নের শুরু, তা আজ বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালকের দায়িত্বে
তুলশীগঙ্গা ও হারাবতী—দুটি নদীর স্রোত মিলেছে, আবার নিজ নিজ গতিপথে ছুটে চলেছে। সেই মোহনা থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার উত্তরে ছোট্ট গ্রাম কাদোয়া। নীরব-নিভৃত সেই গ্রামেই একদিন জন্ম নিয়েছিল একটি স্বপ্ন। স্বপ্নটি ছিল পড়াশোনা করে বড় হওয়া, মানুষের জন্য কাজ করা এবং নিজের যোগ্যতায় প্রতিষ্ঠিত হওয়া। সময়ের স্রোতে সেই স্বপ্ন আজ অনেক দূর এগিয়েছে। কাদোয়ার মাটি ছুঁয়ে শুরু হওয়া সেই পথচলা এখন এসে ঠেকেছে ঢাকার রেলভবনে।
তিনি মো. সুবক্তগীণ—জয়পুরহাটের কৃতী সন্তান, বাংলাদেশ রেলওয়ের দীর্ঘ কর্মজীবনের অভিজ্ঞ কর্মকর্তা। বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর এবার তাঁকে পদায়ন করা হয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) (চলতি দায়িত্ব) পদে।
একজন মানুষের সাফল্যের পেছনে থাকে বহু অদৃশ্য সিঁড়ি। থাকে পরিবারের স্বপ্ন, শিক্ষকের অনুপ্রেরণা, নিজের অদম্য চেষ্টা আর সময়ের কঠিন পরীক্ষায় টিকে থাকার মানসিকতা। সুবক্তগীণের জীবনও যেন তেমনই এক দীর্ঘ সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠার গল্প।
কাদোয়া গ্রামের বিশিষ্ট আলেমে দ্বীন মরহুম হযরত মাওলানা মো. আব্দুস সালাম সরকার (রহ.)-এর নাতি তিনি। ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের আবহে বেড়ে ওঠা সুবক্তগীণ প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ সফলভাবে সম্পন্ন করেন। শিক্ষাজীবনের পর যোগ দেন বাংলাদেশ রেলওয়েতে।
তারপর শুরু হয় আরেক বিশ্ববিদ্যালয়—কর্মজীবনের বিশ্ববিদ্যালয়।
রেলওয়ের এক বিভাগ থেকে আরেক বিভাগে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিনি অর্জন করেন বাস্তব অভিজ্ঞতা। প্রতিটি দায়িত্বকে দেখেছেন নতুন কিছু শেখার সুযোগ হিসেবে। দায়িত্ব পালনে নিষ্ঠা, কর্মদক্ষতা ও নিরলস পরিশ্রম তাঁকে ধীরে ধীরে নিয়ে গেছে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্বের দিকে।
পেছনে তাকানোর সময় ছিল না। ছিল শুধু সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়।
রেলপথের মাঠে, মানুষের পাশে
বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চল দেশের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথ, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুট, চট্টগ্রাম বন্দরকেন্দ্রিক রেল যোগাযোগসহ গুরুত্বপূর্ণ নানা রুট ও স্থাপনার সঙ্গে এ অঞ্চলের কার্যক্রম সরাসরি যুক্ত।
এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলের মহাব্যবস্থকের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সুবক্তগীণকে সামলাতে হয়েছে নানা ধরনের প্রশাসনিক ও পরিচালনাগত চ্যালেঞ্জ।
ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক রাখা, যাত্রীসেবার মানোন্নয়ন, রেলপথ ও স্থাপনার রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপত্তা এবং মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম তদারকিতে তিনি সক্রিয় ছিলেন। রেলপথ, স্টেশন, সেতু ও বিভিন্ন স্থাপনা সরেজমিনে পরিদর্শনের মাধ্যমে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
কারণ তাঁর কাছে রেল মানে শুধু লোহার দুটি লাইন নয়—রেল মানে মানুষের চলাচল, কর্মসংস্থান, অর্থনীতি এবং দেশের এক প্রান্তের সঙ্গে আরেক প্রান্তের সংযোগ।
দায়িত্বের পাশাপাশি মানুষটিও ছিলেন কাছের
প্রশাসনিক দায়িত্বের বাইরে বাংলাদেশ রেলওয়ের ক্রীড়া কার্যক্রমেও তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল। ২০২৬ সালের বাংলাদেশ রেলওয়ের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় তিনি পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বাংলাদেশ রেলওয়ে ক্রীড়া নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মব্যস্ত জীবনে সুস্থ বিনোদন, পারস্পরিক সম্প্রীতি ও কর্মস্পৃহা তৈরিতেও তিনি ভূমিকা রাখেন।
এবার আরও বড় দায়িত্ব
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন অনুবিভাগের প্রশাসন-৫ শাখা থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে মো. সুবক্তগীণকে বদলিপূর্বক বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) (চলতি দায়িত্ব) হিসেবে রেলভবন, ঢাকায় পদায়ন করা হয়। জনস্বার্থে জারি করা এ আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে।
নতুন দায়িত্বে রেলপথ, সেতু, স্টেশন, সিগন্যালিং ব্যবস্থা, বিভিন্ন স্থাপনা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকবেন তিনি।
পূর্বাঞ্চলের মাঠপর্যায়ে কাজ করার যে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা তিনি অর্জন করেছেন, নতুন দায়িত্বে সেটিই তাঁর অন্যতম বড় শক্তি হয়ে উঠবে বলে সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা।
চট্টগ্রামে নতুন নেতৃত্ব
একই প্রজ্ঞাপনে বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (উন্নয়ন) মামুনুল ইসলাম, পিইঞ্জকে বদলি করে বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (পূর্ব) (চলতি দায়িত্ব) হিসেবে চট্টগ্রামে পদায়ন করা হয়েছে।
প্রকৌশল ও উন্নয়ন খাতে অভিজ্ঞ মামুনুল ইসলাম পূর্বাঞ্চলের চলমান অবকাঠামোগত উন্নয়ন, রেলপথ ও স্থাপনা রক্ষণাবেক্ষণ এবং বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
কাদোয়া আজ গর্বিত
একজন মানুষের পদোন্নতি কখনো কখনো শুধু তাঁর নিজের সাফল্য হয়ে থাকে না; তা হয়ে ওঠে তাঁর পরিবার, তাঁর প্রতিষ্ঠান, এমনকি তাঁর জন্মভূমিরও গর্ব।
মো. সুবক্তগীণের ক্ষেত্রেও যেন তাই।
তুলশীগঙ্গা ও হারাবতীর স্রোত হয়তো প্রতিদিনই কাদোয়ার পাশ দিয়ে বয়ে যায়। নদীর সেই স্রোত জানে না, তার তীরের একটি গ্রামের সন্তান কতদূর এগিয়ে গেছেন। কিন্তু কাদোয়ার মানুষ জানেন।
জানেন—এই মাটির সন্তান আজ দেশের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো খাতের দায়িত্বে।
শৈশবের গ্রামের পথ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনা, সেখান থেকে রেলওয়ের কর্মজীবন—দীর্ঘ এই যাত্রাপথে সুবক্তগীণের সাফল্যের মূলমন্ত্র যেন একটিই।
“পদ নয়, দায়িত্বই মানুষকে বড় করে; আর দায়িত্বের প্রতি নিষ্ঠাই একদিন মানুষকে তার কাঙ্ক্ষিত উচ্চতায় পৌঁছে দেয়।”
কাদোয়ার মাটি থেকে শুরু হওয়া সেই পথচলা তাই আজ আর শুধু সুবক্তগীণের ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়। এটি জয়পুরহাটের গর্বের গল্প, নতুন প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার গল্প—স্বপ্ন দেখলে, পরিশ্রম করলে এবং সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করলে ছোট্ট গ্রামের পথও একদিন বড় গন্তব্যে নিয়ে যেতে পারে।
Like this:
Like Loading...
Related
আরো সংবাদ পড়ুন