
ছবিঃ পুরাতন ঝাপসা ছবি এআই দিয়ে পরিস্কার করা
কোর্ট রিপোর্টারঃ ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
দীর্ঘ প্রায় ১১ বছর ধরে বিচারপ্রক্রিয়ার অপেক্ষায় থাকা জয়পুরহাটের আলোচিত হাফেজ ওমর ফারুক রাফি হত্যা মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়েছে। মামলার বাদীর সাক্ষ্য গ্রহণের পর এবার তদন্তকারী কর্মকর্তা (আইও) ও একজন পাবলিক সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করেছেন আদালত। দীর্ঘদিন পর মামলাটি সাক্ষ্যগ্রহণের পর্যায়ে আসায় নিহত রাফির পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে নতুন করে ন্যায়বিচার পাওয়ার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।
নিহত হাফেজ ওমর ফারুক রাফি ছিলেন জয়পুর কণ্ঠ ও সীমান্তের আওয়াজ পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক এবং জয়পুরহাট ইউনাইটেড প্রেস ক্লাবের সভাপতি অ্যাডভোকেট মোঃ শামছুল আলমের একমাত্র পুত্র। একমাত্র সন্তানকে হারানোর দীর্ঘশোক বুকে নিয়ে এত বছর ধরে বিচার প্রক্রিয়ার দিকে তাকিয়ে রয়েছে পরিবারটি।
মামলার অভিযোগ ও সংশ্লিষ্ট নথিতে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালের ২৪ মার্চ পূর্বপরিকল্পিতভাবে রাফিকে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা চালানো হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, মোবাইল ফোনে যোগাযোগের পর সবুজনগর জাতীয় মহিলা সংস্থার প্রায় ১০০ গজ উত্তরে যাওয়ার পর মুরাদ, আমিনুর, নাঈম, পাপ্পু, শুভ, মুক্তারুল, অনু ও নীরবসহ অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজন তাকে ঘিরে ধরে। এ সময় হামলাকারীদের হাতে মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্র ছিল বলে মামলার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
অভিযোগে আরও বলা হয়, হামলাকারীরা রাফির মাথায় উপর্যুপরি আঘাত করে এবং তার ডান চোখে গুরুতর আঘাত করে। এতে তার ডান চোখ নষ্ট হয়ে যায় এবং চোয়াল ভেঙে যায়। এছাড়া শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর জখম ও কাটা-ছেঁড়ার চিহ্নের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
গুরুতর আহত অবস্থায় রাফিকে জয়পুরহাট আধুনিক জেলা হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে বগুড়ায় নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়া হলে স্কয়ার হাসপাতাল এবং পরে বসুন্ধরা এলাকার অ্যাপোলো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। সেখানেই চিকিৎসাধীন ২৭/০৩/২০২৬ সালে মৃত্যু হয় বলে মামলার নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
দীর্ঘ সময় পর মামলাটি বিচারিক পর্যায়ে এগিয়ে যাওয়ায় রাফির পরিবারের সদস্যদের মধ্যে স্বস্তির পাশাপাশি গভীর আবেগও তৈরি হয়েছে। গত ৫ জুন ২০২৬ বাদীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। এরপর মামলার ধারাবাহিকতায় আজ তদন্তকারী কর্মকর্তা (আইও) এবং একজন পাবলিক সাক্ষী আদালতে সাক্ষ্য প্রদান করেন।
সাক্ষ্যগ্রহণের সময় মামলার ঘটনার বিভিন্ন দিক, তদন্তের অগ্রগতি, আসামিদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ এবং মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আলামত ও অন্যান্য বিষয় আদালতের সামনে উপস্থাপিত হয় বলে জানা গেছে।
রাফি হত্যাকাণ্ড শুধু একটি পরিবারের একমাত্র সন্তান হারানোর ঘটনা নয়; দীর্ঘদিন ধরে বিচারপ্রক্রিয়ার অপেক্ষা করে থাকা একটি পরিবারের অসহায়ত্ব ও প্রত্যাশারও প্রতিচ্ছবি। সন্তানের হত্যার বিচার দেখতে দীর্ঘ ১১ বছর ধরে অপেক্ষা করছেন তার বাবা অ্যাডভোকেট মোঃ শামছুল আলম।
আইনজীবী ও সাংবাদিক হিসেবে পেশাগত জীবনে মানুষের অধিকার, ন্যায়বিচার ও সত্য প্রকাশের সঙ্গে যুক্ত থাকা একজন বাবার কাছে নিজের একমাত্র সন্তানের হত্যার বিচার পাওয়ার অপেক্ষা নিঃসন্দেহে আরও বেদনাদায়ক।
মামলার সাক্ষ্য ও প্রমাণ নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করে আদালত আইন অনুযায়ী দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবেন। একই সঙ্গে প্রকৃত অপরাধী যে-ই হোক, যথাযথ প্রমাণের ভিত্তিতে তার আইনের আওতায় আসাই তাদের প্রত্যাশা।
রাফি হত্যা মামলার বর্তমান সাক্ষ্যগ্রহণ সেই বিচারপ্রক্রিয়ারই গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ। দীর্ঘদিন পর সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হওয়ায় এখন মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তির দিকে এগোবে, এমন প্রত্যাশা নিহতের পরিবার ও স্থানীয় সচেতন মহলের।
মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে মামলা পরিচালনা করছেন এপিপি মোঃ আহসান হাবিব চপল, অ্যাডভোকেট। সর্বশেষ সাক্ষ্যগ্রহণে তদন্তকারী কর্মকর্তা ও একজন পাবলিক সাক্ষী আদালতে সাক্ষ্য প্রদান করেন।
দীর্ঘ ১১ বছর পর শুরু হওয়া এই সাক্ষ্যগ্রহণ এখন রাফি হত্যা মামলার বিচারপ্রক্রিয়াকে কোন পর্যায়ে নিয়ে যায়, সেটিই দেখার বিষয়। নিহতের পরিবার, স্বজন ও স্থানীয়দের প্রত্যাশা, দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে দ্রুত, নিরপেক্ষ ও ন্যায়সংগত রায় দেওয়া হবে।
একটি পরিবার হারিয়েছে তাদের একমাত্র সন্তান; ১১ বছর ধরে তারা অপেক্ষা করছে শুধু একটি শব্দের জন্য—‘ন্যায়বিচার’।