1. wjoypurkantha@gmail.com : জয়পুর কণ্ঠ : জয়পুর কণ্ঠ
  2. info@www.joypurkantha.com : জয়পুর কণ্ঠ :
শনিবার, ৩০ মে ২০২৬, ১১:২১ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
জয়পুর কণ্ঠ, সাহিত্য পাতা ঈদুল আযহা উপলক্ষে কোরবানির বর্জ্য দ্রুত অপসারণে ইমামদের সহযোগিতা চাইলেন রাসিক প্রশাসক সাপাহারে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত ধামইরহাটে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স সপ্তাহ উদ্বোধন সাপাহারে কোরবানির পশুর চামড়া সংরক্ষণে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি জাতীয় প্রতিভা অন্বেষণে কৃতিত্বের স্বাক্ষর, পাঁচবিবির আতহার ইবতিদার সাফল্য সাপাহারে গভীর রাতে ডিবির মাদকবিরোধী অভিযান, ট্যাপেন্টাডলসহ দুই জন গ্রেফতার জয়পুরহাটে জেলা পরিষদের কার্যক্রম পর্যালোচনা সভা কালাইয়ে দুধ উৎপাদন, পরিবহন ও সংরক্ষণের উপর খামারিদের দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ লাকড়ি সরাতে গিয়ে প্রাণ গেল অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূর

জয়পুর কণ্ঠ, সাহিত্য পাতা

প্রতিনিধির নাম :
  • প্রকাশিত: শনিবার, ৩০ মে, ২০২৬
  • ০ বার পড়া হয়েছে

​ছড়াৎ শব্দ ও নিয়তির কোলাহল

​শাহজাহান সরকার

​আকাশের নীলচে ক্যানভাসের দিকে শূন্য দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে আব্দুল মজিদ। তার বর্তমান পরিচয়টা বড্ড সাদামাটা—সে একজন ডাব বিক্রেতা। অথচ এককালে এই চত্বরেই তার পায়ের আওয়াজে ধুলো উড়ত। এখন তার ডানহাতে ছেনি, বাঁহাতে ধারালো দা। ডাব কাটার ‘থপথপ’ শব্দটাই এখন তার জীবনের একমাত্র ছন্দ।

​একটা ডাবের মাথায় কোপ দিতেই ভেতর থেকে ‘ছড়াৎ’ করে মিষ্টি পানি ছিটকে বের হয়ে আসে। সেই পানির দিকে তাকিয়ে মজিদের বুকের ভেতরটা মুচড়ে ওঠে। ডাবের ওই ফিনকি দিয়ে বের হওয়া পানির মতোই যেন তার হৃদপিণ্ড থেকে অদৃশ্য রক্তক্ষরণ হচ্ছে। কোথা থেকে কী হয়ে গেল! জীবনের হিসাব মেলাতে মেলাতে গত কয়েক মাসে তার দাড়ি আর চুলে পাক ধরেছে দ্বিগুণ। যাদের জন্য জীবনের সোনালী সময়টা বিলিয়ে দিয়েছিল, তারা আজ তাকে দেখলেই চশমা ঠিক করার বাহানায় মুখ ঘুরিয়ে নেয়। সব নিয়তি বলে মেনে নেওয়া ছাড়া মজিদের আর কোনো উপায় নেই।

​এককালে আব্দুল মজিদের চলন-বলন ছিল রাজকীয়। একটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের মাঠপর্যায়ের সক্রিয় কর্মী হিসেবে তাকে সবাই সমীহ করত। দলীয় কার্যালয় আর পাড়ার মোড়ে মোড়ে তার আসাযাওয়ার ভেতরেই সংসারটা বেশ ভালোই চলছিল। বড় নেতাদের ফরমায়েশ খাটা, মিছিলের লোক জোগাড় করা আর দিনশেষে ‘তোলা’ তোলা টাকায় পকেট গরম থাকত। মজিদ ভাবত, এই সুদিন বুঝি কোনোদিন ফুরোবে না। ‘এই দিন দিন নয়, আরও দিন আছে’—প্রবাদটা সে ভুলেই গিয়েছিল।

​কিন্তু হঠাৎ একদিন ঝড়ের মতো রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হয়ে গেল। ক্ষমতার তাসের ঘর ভেঙে পড়ার সাথে সাথে মজিদের সাজানো পৃথিবীটাও ওলটপালট হয়ে গেল। গতকাল যারা তাকে দেখে চেয়ার ছেড়ে দাঁড়াত, আজ তারা তাকে বসার ভদ্রতাটুকুও দেখায় না। অতীতের জীবনে যা আয় করেছিল, তা দুই হাতে খরচ করেছে, ভবিষ্যতের জন্য একটা টাকাও জমায়নি। আজ সে সবার কাছে অপাংক্তেয়, এক ব্রাত্য মানুষ।

​এদিকে ঘরে বাড়ন্ত স্কুল-কলেজ পড়ুয়া ছেলেমেয়ে। সংসারে আয়ের কোনো উৎস নেই। চেনা মানুষদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও একটা টাকা ধার পায়নি মজিদ; ক্ষমতা হারানো মানুষের দিকে কেউ সুনজরে তাকায় না। অনেক চেষ্টা আর তদ্বিরের পর, শেষমেশ চড়া সুদে কিছু টাকা জোগাড় করে রাস্তার মোড়ে এই ডাবের দোকানটা দেয় সে।
​ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! কিছুদিন আগেও এই রাস্তার ফুটপাতে দোকান বসানোর অনুমতি পাইয়ে দিতে কত মানুষ মজিদের পেছনে পেছনে টাকার ব্যাগ নিয়ে ঘুরত। আর আজ, নিজেকেই রাস্তার পাশে চারটে ডাব নিয়ে বসার জন্য প্রতিদিন স্থানীয় এক লাইনম্যানকে পঞ্চাশ টাকা করে ‘বকশিশ’ গুনতে হয়। নিয়তি একেই বলে!

​সামনে কোরবানির ঈদ। আজ হাটবার। মজিদের দোকানের সামনে দিয়েই দলে দলে মানুষ গরু, ছাগল আর ভেড়া নিয়ে যাচ্ছে। পশুগুলোর গলার ঘণ্টার ‘টুংটাং’ শব্দে বাতাস ভারী হয়ে উঠছে। মজিদ মাঝে মাঝে ক্রেতাদের ভিড়ে নাক গলিয়ে দু-একটার দাম জিজ্ঞেস করে। অবচেতন মনে একটা স্বপ্ন বোনে—যদি এবার একটা কোরবানি দেওয়া যেত! কিন্তু পকেটের শূন্যতা পরক্ষণেই সেই স্বপ্নে জল ঢেলে দেয়। সে বিড়বিড় করে বলে, “না, এবার আর কোরবানি হবে না।”

​অথচ মজিদের স্ত্রী ফাতেমা সেলাইয়ের ফোঁড়ে ফোঁড়ে দিনরাত কষ্ট করে কিছু টাকা জমিয়েছিল। পরিমাণ খুব বেশি নয়, পনেরো হাজার টাকার মতো। মজিদ একদিন ফাতেমাকে অনুনয় করে বলেছিল, “বউ, এখান থেকে অর্ধেক টাকা আমাকে দাও। ডাবের দোকানের ঋণটা শোধ করি, আর বাকিটা দিয়ে তোমার জন্য একটা বরকি (ছাগল) কিনে দিই। ওটা পুষলে পরে লাভ হবে।”

​কিন্তু অর্থনৈতিক টানাপোড়েন যেখানে তীব্র, সেখানে ভালোবাসার সুর নরম হয়ে যায়। ফাতেমা মজিদের কথায় কান দেয়নি। নিজের জমানো টাকার চৌদ্দ হাজার টাকা দিয়ে সে বাপের বাড়ির কোরবানি গরুর একটা ‘ভাগ’ কিনে নিয়েছে। মজিদের পুরুষালি অহংকারে এই ঘটনা তীব্র আঘাত হানে।

​ঈদের দিন। মজিদ ঘরে বসে থাকেনি। লোকলজ্জা আর ভেতরের হাহাকার আড়াল করতে সে ডাবের দোকান খোলা রেখেছিল। দিনশেষে ক্লান্ত শরীরে যখন রাতে বাড়ি ফিরল, দেখল পাতে ধোঁয়া ওঠা গরুর মাংস আর ভাত। ফাতেমা বাপের বাড়ি থেকে মাংসের ভাগ নিয়ে এসেছে।

​মজিদ ভাতের থালার দিকে তাকিয়ে রইল। এই মাংসের প্রতিটি টুকরো যেন তাকে তার বর্তমান ব্যর্থতা আর অপদার্থতাকে উপহাস করছে। সে চামচটাও ছুঁল না। অস্পৃশ্য সেই খাবার ফেলে রেখে সোজা বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল।

​সে রাতে মজিদের চোখে ঘুম এলো না। চারিদিকের নিস্তব্ধতা ফুঁড়ে কেবলই চিন্তা আর দুশ্চিন্তার ঢেউ আছড়ে পড়ছিল তার মগজে। ‘কী হবে? আগামী দিনগুলো কীভাবে কাটাব?’ সারারাত বিছানায় এপাশ-ওপাশ করতে করতে কখন যে ভোরের আলো ফুটল, মজিদ টেরই পায়নি। কোনো কূল-কিনারা সে খুঁজে পায়নি।

​পরদিন সকালে মজিদ আবার এসে বসেছে তার চেনা ডাবের দোকানে। হাত দুটো স্বয়ংক্রিয়ভাবে দা আর ছেনি তুলে নেয়। চোখের সামনে দিয়ে উৎসবমুখর মানুষ হেঁটে যাচ্ছে। মজিদ শূন্য দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে রাস্তার মোড়ে, কোনো এক খরিদ্দারের আশায়।

​আজকের দিনটা কেটে যাবে, ডাবও কিছু বিক্রি হবে। কিন্তু আগামী বছর আবার ঘুরে আসবে ঈদ। আবার আসবে কোরবানির মৌসুম। মজিদ তখন কী করবে? ডাব কাটার ‘থপথপ’ শব্দের আড়ালে এই একটাই প্রশ্ন মজিদের বুকে ফিনকি দিয়ে রক্তক্ষরণ ঘটাতে থাকে। উত্তরহীন এক ভবিষ্যতের দিকে চেয়ে আব্দুল মজিদ আবার ডাবের গায়ে কোপ বসায়—ছড়াৎ!

Leave a Reply

আরো সংবাদ পড়ুন
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিতঃ জয়পুর কণ্ঠ
প্রযুক্তি সহায়তায়: ইয়োলো হোস্ট