
ছবিঃ সীমান্তের আওয়াজ
ক্ষেতলাল (জয়পুরহাট) প্রতিনিধি: ১২ জুন ২০২৬
জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার তুলশীগঙ্গা নদীর তীরবর্তী সন্যাস মন্দির প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয়েছে প্রায় দুইশ বছরের ঐতিহ্যবাহী সন্যাসতলীর ঘুড়ির মেলা। জ্যৈষ্ঠ মাসের শেষ শুক্রবার আয়োজিত এই গ্রামীণ মেলাকে ঘিরে উৎসবের আমেজে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি এটি এখন হিন্দু-মুসলিমসহ সব ধর্মের মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, সন্যাসী পূজাকে কেন্দ্র করে দুই শতাব্দীরও বেশি আগে এই মেলার সূচনা হয়। সময়ের পরিক্রমায় মেলাটি শুধু ধর্মীয় আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে গ্রামীণ ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সামাজিক সম্প্রীতির প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। প্রতি বছর নির্ধারিত দিনে আশপাশের গ্রাম ছাড়াও দূর-দূরান্ত থেকে হাজারো মানুষ মেলায় অংশ নিতে ছুটে আসেন।
শুক্রবার সকাল থেকেই মেলা প্রাঙ্গণে দোকানিরা তাদের পসরা সাজিয়ে বসেন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ভিড়ে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। রঙ-বেরঙের ঘুড়ি ছিল মেলার প্রধান আকর্ষণ। শিশু-কিশোরদের পাশাপাশি তরুণদের মধ্যেও ঘুড়ি কেনার আগ্রহ ছিল চোখে পড়ার মতো।
মেলায় বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি, চিনির তৈরি শাহী জিলাপি, খেলনা, প্রসাধনী সামগ্রী, বাঁশ-কাঠ ও লোহার তৈরি গৃহস্থালি উপকরণ এবং মাছ ধরার নানা সরঞ্জামের দোকানে ছিল উপচে পড়া ভিড়। ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ বাজারের আবহ দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে।
মেলায় আসা মহব্বতপুর গ্রামের দুলাল হোসেন ও জিয়াপুর গ্রামের কাজী রফিকুল ইসলাম জানান, তাঁদের পূর্বপুরুষরাও এই মেলায় আসতেন। সেই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় এখনো প্রতি বছর তাঁরা পরিবারের সদস্যদের নিয়ে মেলায় আসেন। নওগাঁ, বগুড়া ও দিনাজপুরসহ বিভিন্ন জেলা থেকে আগত দর্শনার্থীরাও জানান, বিশেষ করে ঘুড়ি কেনার জন্যই তাঁরা এই মেলায় অংশ নেন।
সন্যাস মন্দির কমিটির সভাপতি মন্টু চন্দ্র বলেন, “এটি শুধু একটি মেলা নয়, আমাদের অঞ্চলের ঐতিহ্য ও সম্প্রীতির প্রতীক। হিন্দু-মুসলিম সবাই মিলেই সুন্দর পরিবেশে মেলাটি পরিচালনা করি। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ব্যবসায়ীরাও এখানে আসেন।”
স্থানীয়দের মতে, মেলাকে ঘিরে আশপাশের গ্রামগুলোতে উৎসবের আবহ সৃষ্টি হয়। আত্মীয়-স্বজনদের দাওয়াত, জামাই আপ্যায়ন এবং পারিবারিক মিলনমেলার আয়োজন গ্রামীণ সংস্কৃতিকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।
এদিকে মেলায় আগত দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ক্ষেতলাল থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মুহঃ আব্দুল করিমের নেতৃত্বে পুলিশের একটি টিম সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করে।
দুই শতকের ঐতিহ্য বহনকারী সন্যাসতলীর ঘুড়ির মেলা আজও গ্রামীণ জনপদের সংস্কৃতি, সম্প্রীতি ও লোকজ ঐতিহ্যের এক উজ্জ্বল নিদর্শন হিসেবে টিকে আছে। আধুনিকতার এই যুগেও এমন আয়োজন গ্রামীণ বাংলার শেকড়ের সঙ্গে মানুষের বন্ধনকে আরও দৃঢ় করে চলেছে।